রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে মাত্র ৩২ ঘণ্টার ব্যবধানে টানা চারটি ভূমিকম্পের ঘটনা জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুক্রবার দুপুরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে দুলে ওঠা ঢাকার মানুষের ভয় কাটার আগেই শনিবার সকাল ও সন্ধ্যায় আরও তিন দফা কম্পন অনুভূত হয়।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন-এই ধারাবাহিক ছোট কম্পনগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনার ইঙ্গিতও হতে পারে।
শুক্রবারের প্রধান কম্পনের পর শনিবার সকালেই নরসিংদীর পলাশ এলাকায় আরেকটি ছোট ভূমিকম্প ঘটে। একই দিন সন্ধ্যায় রাজধানীর বাড্ডায় অনুভূত হয় আরও দুটি ভূমিকম্প। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরপর এ ধরনের ছোট কম্পনকে ‘অ্যাফটারশক’ বলা হলেও কিছু ক্ষেত্রে এগুলো বড় ভূমিকম্পের আগাম বার্তাও হতে পারে।
ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ জোনে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া জানান, বাংলাদেশের নিচ দিয়ে তিনটি প্রধান টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষ চলছে। এর পূর্বদিকে রয়েছে বার্মিজ সাবপ্লেট, পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট। ইন্ডিয়ান প্লেটের অংশ দুই দিকেই তলিয়ে যাচ্ছে-একদিকে বার্মিজ সাবপ্লেটের নিচে, অন্যদিকে ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে। এই পুরো অঞ্চলকে বলা হয় সাবডাকশন জোন, যা পৃথিবীর ভয়াবহতম ভূমিকম্প উৎপন্ন হওয়ার প্রধান ক্ষেত্র।
তিনি বলেন, “ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট-এই তিন অঞ্চলের অবস্থান সাবডাকশন জোনের খুব কাছেই। ফলে বড় ভূমিকম্প হওয়ার ভৌত প্রমাণ ও ঐতিহাসিক নজির উভয়ই রয়েছে।”
তাঁর মতে, উত্তরে ডাউকি ফল্ট ও মধুপুর গারোর নিচেও সক্রিয় ফল্ট আছে। শীতলক্ষ্যা নদীর ধারে ভূগর্ভস্থ চাপও দীর্ঘদিন ধরে জমছে। তাই রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি অস্বীকার করা যায় না।
ফোরশক নাকি সাধারণ কম্পন ২-৩ দিন গুরুত্বপূর্ণ
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ আর্থকোয়াক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী মনে করেন, নরসিংদী ও ঢাকায় শনিবারের তিনটি ছোট ভূমিকম্প উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
তিনি বলেন, “এভাবে পরপর ছোট ছোট ভূমিকম্প হওয়া অনেক সময় বড় কম্পনের আগাম সঙ্কেত-যাকে ‘ফোরশক’ বলা হয়। আগামী দুই-তিন দিনে আরো কিছু কম্পন হলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাড়বে।”
তাঁর মতে, পরিস্থিতি বাড়তে থাকলে ঢাকা অঞ্চলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার মতো পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
টানা কম্পনে মানুষের মানসিক চাপ বাড়ছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, বারবার কম্পন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। শুক্রবারের কম্পনের পর অনেকেই আতঙ্কে রাত কাটিয়েছেন। বারবার ছোট কম্পনে মানুষের ভীতি আরো বাড়ছে।
তিনি জানান, ঢাকার উত্তর–পূর্ব দিকে সাবডাকশন জোন ও ডাউকি ফল্টই সবচেয়ে বড় হুমকি। বড় ভূমিকম্প মূল ঢাকা শহরে না হলেও এর প্রভাব রাজধানীতে সবচেয়ে ভয়াবহ হবে।
ভবন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন-সরকারি উদ্যোগ জরুরি
পরপর কম্পনে সাধারণ নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জেগেছে-
১. যে ভবনে থাকছি সেটি কত মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল?
২. কর্মস্থলের ভবনের নিরাপত্তা কেমন?
৩. জরুরি পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাবে কি?
রাজধানীর হাসপাতালগুলো কি ভূমিকম্পে টিকে থাকবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো জরুরি ভিত্তিতে শনাক্ত করতে হবে। ৭–৮ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সংকীর্ণ রাস্তা প্রশস্ত করা ও নিয়মবহির্ভূত ভবন দ্রুত চিহ্নিত করা দরকার।
এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়ানো, মহড়া আয়োজন, এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠনের সুপারিশ করেছেন তাঁরা।
আতঙ্ক নয় প্রস্তুতিই এখন প্রধান পথ
বিশেষজ্ঞদের অভিমত ভূমিকম্প থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু প্রস্তুতি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কয়েকগুণ কমাতে পারে।
এ ধরনের ধারাবাহিক ভূমিকম্প বড় বিপদের পূর্বাভাস হতে পারে, আবার নাও হতে পারে তাই আতঙ্কিত না হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
দৈনিক টার্গেট 















