তুরস্কভিত্তিক কোচ হোল্ডিং-এর শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বেকোর সহযোগী সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড প্রথমবারের মতো তাদের নিজস্ব আধুনিক গৃহস্থালী যন্ত্রপাতি উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বৈদ্যুতিক সংযোগ তারের উপাদান (ওয়্যার হারনেস) রপ্তানি শুরু করেছে।
এই উদ্যোগ বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশের সক্রিয় অংশগ্রহণকে আরো জোরালো করেছে।
এই রপ্তানি কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বেজার অতিরিক্ত সচিব জনাব সালেহ আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, সিঙ্গার বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব এমএইচএম ফাইরোজ, কারখানা পরিচালক জনাব হাকান আলতিনিশিকসহ সিঙ্গারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
মাত্র কয়েক মাস আগে চালু হওয়া উৎপাদন কেন্দ্র থেকে এ ধরনের প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানি শুরু হওয়া নিঃসন্দেহে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও মানসম্পন্ন উৎপাদনের প্রতিফলন। এই প্রকল্পের আওতায় বেকোর অন্তর্ভুক্ত ১৪টি বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্রে এই উপাদান সরবরাহ করা হবে এবং অন্তত ৫টি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় এক হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আধুনিক পরিবেশগত মানদণ্ড এলইইডি গোল্ড অনুসারে নির্মিত কারখানাটি ১,৩৫,০০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এটি নির্মাণে সময় লেগেছে মাত্র ১৮ মাস এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ৮ মাসের মধ্যেই উৎপাদন শুরু হয়। এই প্ল্যান্টে সৌরশক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতি ও জিরো-ওয়েস্ট (অর্থাৎ বর্জ্যশূন্য) নীতির অনুসরণে নির্মাণ করা হয়েছে। এটি বেকোর ২০৫০ সালের মধ্যে নিট-জিরো কার্বন নিঃসরণ অর্জনের লক্ষ্যের অংশ।
বর্তমানে এই প্ল্যান্টে রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন গৃহস্থালী যন্ত্র উৎপাদিত হচ্ছে। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে বৈদ্যুতিক সংযোগ তারের উপাদান। দেশীয়ভাবে ৯০ শতাংশের বেশি পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের বাজারে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরো দৃঢ় করছে।
এই কারখানা একটি শক্তিশালী দেশীয় সরবরাহকারী নেটওয়ার্কও গড়ে তুলবে, যার ফলে আমদানির উপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে এবং শিল্পে স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে।
সিঙ্গার বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এমএইচএম ফাইরোজ বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদন মানচিত্রে একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এই প্রকল্প আমাদের টেকসই উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানির বৈচিত্র্য এবং শিল্পে উৎকর্ষতার প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়ন করেছে।”
কারখানা পরিচালক হাকান আলতিনিশিক বলেন, “এই অর্জন আমাদের দলের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি এটি বাংলাদেশের উচ্চ-মূল্যের উৎপাদন সক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।”
সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের অন্যতম বৃহৎ গৃহস্থালী যন্ত্র বিক্রেতা, যার সারা দেশে রয়েছে ৪৬৩টি নিজস্ব খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র এবং ১,০০০-এর বেশি ডিলার স্টোর। ১৯০৫ সালে সিঙ্গার এ দেশে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি সিঙ্গার, বেকো এবং অন্যান্য ব্র্যান্ডের অধীনে টিভি, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন টেকসই ভোক্তা পণ্য বিক্রি করছে। প্রতিষ্ঠানটির ৫৭ শতাংশ মালিকানা রয়েছে বেকোর অধীনে এবং অবশিষ্ট শেয়ার ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে লেনদেনযোগ্য।
বেকো একটি আন্তর্জাতিক গৃহস্থালী যন্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, যার কার্যক্রম রয়েছে বিশ্বের ৫৫টির বেশি দেশে। প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কর্মী এবং ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বহু উৎপাদন কেন্দ্র। বেকো বর্তমানে ইউরোপে পরিমাণগত বাজার শেয়ারে শীর্ষে রয়েছে এবং ২০২৪ সালে এর সংযুক্ত রাজস্ব ছিল ১০.৬ বিলিয়ন ইউরো। প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে ২৯টি গবেষণা ও ডিজাইন কেন্দ্র, যেখানে ২,৩০০ গবেষক কাজ করছেন এবং তারা ইতোমধ্যে ৩,৫০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছে।
২০২৪ সালে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি মূল্যায়নে বেকো টানা ছয় বছর সর্বোচ্চ স্কোর অর্জন করেছে এবং ডাউ জোন্স সাসটেইনেবিলিটি সূচকে টানা আট বছর ধরে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
টাইম ম্যাগাজিন এবং স্ট্যাটিস্টা প্রকাশিত ২০২৫ সালের ‘বিশ্বের সবচেয়ে টেকসই কোম্পানির তালিকায়’ বেকো ১৭তম স্থান লাভ করেছে। বেকোর দৃষ্টিভঙ্গি “বিশ্বকে সম্মান করা, বিশ্বজুড়ে সম্মানিত হওয়া।”
দৈনিক টার্গেট 
























