সুন্দরবনের গহীনে জীবিকা খুঁজতে গিয়ে গত ২৫ বছরে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন। বাঘের আক্রমণে আহত হয়েছেন আরও ৯৫ জন। এই পরিসংখ্যান বন বিভাগের হলেও, স্থানীয়দের মতে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অনেক হতাহতই রয়ে গেছেন সরকারি হিসাবের বাইরে শুধুই “অদৃশ্য” শিকারে পরিণত হয়েছেন।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!শরণখোলার বাসিন্দা মোঃ আব্দুস সামাদ হাওলাদারের জীবন বদলে যায় এক শুক্রবারে। কাঠ সংগ্রহের সময় বাঘের কামড়ে হারান নিজের দুই চোখ। বেঁচে ফিরলেও জীবন অন্ধকারে ঢেকে যায় চিরদিনের মতো। তার মতো বহু বনজীবী আজও বয়ে চলেছেন সেই আক্রমণের ভয়াবহ স্মৃতি।
২০২৩ সালের অক্টোবরের শুরুর দিন, শিপার হাওলাদার নামের এক তরুণ মাছ ধরতে গিয়ে হারিয়ে যান। চারদিন পর ধানসাগরের এক বনের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় শুধু তার বিচ্ছিন্ন মাথা ও পরনের প্যান্ট। পরিবারের দাবি, বাঘই তাকে হত্যা করেছে। তবে সরকারি অনুমতি ছাড়াই বনে প্রবেশ করায় পরিবারটি কোনো সরকারি সহায়তা পায়নি। শিপারের ছোট্ট মেয়ে সিনথিয়া, স্ত্রী মোরশেদা ও বৃদ্ধ মা-বাবা আজ বেঁচে আছেন অনিশ্চয়তার প্রহর গুনে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বাঘের আক্রমণে কেউ মারা গেলে পরিবার পায় এক লাখ টাকা, আহত হলে ৫০ হাজার এবং বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলে ২৫ হাজার টাকা। তবে এই অর্থ সহায়তার পথ অনেক সময়ই বন্ধ থাকে অনুমতির জটিলতায়। বৈধ পাস-পারমিট না থাকলে সহানুভূতিরও মূল্য থাকে না।
২০১১ সালে ক্ষতিপূরণের একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার, যার আওতায় এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে প্রায় ৬৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা, দুঃখ ও চাহিদার তুলনায় এই সহায়তা অতি সামান্য বলেই মনে করেন স্থানীয়রা।
বন সংলগ্ন গ্রামগুলোর মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা। বিশেষত যেসব নারীরা স্বামী হারিয়েছেন বাঘের থাবায়, তাদের জীবনযাত্রা যেন আর দুঃস্বপ্ন না হয়।
বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বাঘ বিধবাদের জন্য কিছু খালে মাছ ধরার অনুমতি, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় বিশেষ সহায়তা, বনাঞ্চলে ফেন্সিং ইত্যাদি কার্যক্রম চলছে। ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৬০ কিলোমিটার ফেন্সিং ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
বাঘের সংখ্যা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। বন বিভাগের হিসাবে ২০১৮ সালে যেখানে বাঘ ছিল ১১৪টি, সেখানে ২০২৩ সালের জরিপে সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২৫টি। ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে এই হিসাব করা হয়। কর্তৃপক্ষ বলছে, নিরাপত্তা জোরদার, অপরাধ দমন ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের কারণে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে।
তবে বাঘ সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, এই বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক টার্গেট অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা ১২ বছরে দ্বিগুণ হওয়ার কথা, অথচ ১৫ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে মাত্র ১১টি।
‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের সমন্বয়কারী নুর আলম শেখ বলেন, “বাঘের সংখ্যা বাড়লেও এর আবাসস্থল আজ হুমকির মুখে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, অন্যদিকে বিষ দিয়ে মাছ ধরা উভয়ই বনের বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক। তাছাড়া আন্তর্জাতিক পাচারচক্র এখনও বনে সক্রিয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাঘের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। বাঘের খাদ্যশৃঙ্খলা, প্রজনন পরিবেশ, নিরাপদ আবাসস্থল সব কিছুর ওপরই নজর দিতে হবে। নয়তো এই বিশ্ব ঐতিহ্য একদিন হারিয়ে যাবে, থেকে যাবে শুধু দুঃখগাথা।
সংক্ষিপ্ত চিত্র
- ২০০১–২০২৫: বাঘের আক্রমণে মৃত্যু: ৪২৫ জন
- আহত: ৯৫ জন
- ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে: ৬৮.৫ লাখ টাকা
- ২০১৮ সালে বাঘ: ১১৪টি
- ২০২৩ সালে বাঘ: ১২৫টি
- ক্ষতিপূরণ নিয়ম: মৃত্যুতে ১ লাখ, আহত হলে ৫০ হাজার টাকা
- ফেন্সিং করা হয়েছে: ৬০ কিমি (প্রস্তাব: ৭৪ কিমি)