বাংলাদেশে স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা, সাংবাদিক নিরাপত্তা এবং সংবাদপেশাকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে নতুন করে সরব হয়েছেন সাংবাদিক নেতারা। তাঁরা বলছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমকে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই মর্যাদা এখনো সংবিধানে প্রতিফলিত হয়নি।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম প্রহরী। অথচ দেশে এখনো সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন, আইনগত সুরক্ষা এবং সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, সত্য প্রকাশের কারণে বহু সাংবাদিককে মামলা, হয়রানি, হামলা ও চাকরিচ্যুতির শিকার হতে হচ্ছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে “অপরাধ” হিসেবে দেখা হয় বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। সাংবাদিক নেতাদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু গণমাধ্যমের জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
“বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম” এবং “বাংলাদেশ সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি”র নেতারা দাবি করেন, দেশের সাংবাদিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অধিকাংশ সাংবাদিক এখনো নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, চিকিৎসা সুবিধা, ঝুঁকি বীমা, পেনশন বা চাকরির নিশ্চয়তা পান না। অনেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংবাদকর্মী মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সংগঠনের সভাপতি সাংবাদিক আহম্মেদ আবু জাফর বলেন, “রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে বিপুল বাজেট থাকলেও সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ এখনো খুব সীমিত। অথচ দুর্নীতি, অনিয়ম ও জনস্বার্থ রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।”
সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর ইমন বলেন, “এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং জনগণের জানার অধিকারের আন্দোলন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত গণমাধ্যম সংস্কারের লড়াই চলবে।”
তাঁরা অভিযোগ করেন, দেশে বহু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও প্রকৃত সাংবাদিকতা চর্চার পরিবেশ সংকুচিত হয়েছে। সাংবাদিকদের একটি অংশকে “ভুয়া সাংবাদিক”, “চাঁদাবাজ” বা “দালাল” আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা পুরো পেশাটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এর পেছনে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, অনিয়ন্ত্রিত নিয়োগ এবং পেশাগত মানদণ্ডের অভাবকে দায়ী করা হয়।
বিবৃতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-
- গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের “চতুর্থ স্তম্ভ” হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া
- স্বাধীন ও স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন গঠন
- সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন
- সাংবাদিক নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা
- নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন
- ডিজিটাল নিরাপত্তাসহ মতপ্রকাশ সীমিতকারী বিতর্কিত আইন বাতিল
- সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল বৃদ্ধি
- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রতিনিধি নিয়োগ
- গণমাধ্যম শিল্পকে পৃথক শিল্পখাত হিসেবে ঘোষণা
এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে প্রশিক্ষিত সাংবাদিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবিও জানানো হয়।
বিবৃতিতে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোর বিচারহীনতার প্রসঙ্গও উঠে আসে। বিশেষ করে আলোচিত সাগর-রুনি হত্যা মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়।
সাংবাদিক নেতারা আরও বলেন, “গণমাধ্যম কখনো রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়। বরং একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম সরকারকে ভুল ধরিয়ে দেয়, দুর্নীতি উন্মোচন করে এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সহায়তা করে।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলেন, নতুন নেতৃত্বের অধীনে দেশ যদি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগোতে চায়, তাহলে স্বাধীন গণমাধ্যমের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এখন সময়ের দাবি।
বিবৃতির শেষাংশে বলা হয়, “ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হলেও ইতিহাস টিকে থাকে। আর সেই ইতিহাস রচনায় স্বাধীন কলমের ভূমিকা কখনো মুছে যায় না।”
মোঃ আতাউর রহমান 























