ঋণ-সুদে চাপে বাংলাদেশ

রাজনীতি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণের চাপ এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গত দেড় দশকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সরকারকে বাড়তি চাপে পড়তে হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ডলারের দাম, সুদের হার এবং ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৪১ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এ সময়ে নতুন করে যোগ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলারের ঋণ। দেশের স্বাধীনতার পর মোট বিদেশি ঋণের বড় অংশই এই সময়ের মধ্যে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অধিকাংশ ঋণ এমন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে যেখান থেকে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় না। ফলে ঋণ পরিশোধের সময় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে রিজার্ভের ওপর। পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি। ২০০৯ সালে প্রতি ডলারের দাম ছিল প্রায় ৬৯ টাকা, যা ২০২৪ সালে এসে ১২০ টাকার ওপরে পৌঁছে যায়। কোনো কোনো সময়ে ব্যাংকিং খাতে ডলার বিক্রি হয়েছে ১৩২ টাকাতেও। এতে একই ঋণ পরিশোধে সরকারের টাকার ব্যয়ও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

শুধু ডলারের দামই নয়, বৈদেশিক ঋণের সুদের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে অনেক ঋণের সুদহার ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে ছিল, বর্তমানে তা ৭ থেকে ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় এই হার আরও বেড়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারভিত্তিক সুদ ও বিনিময় হার নির্ধারণের কারণে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাতের ঋণ পরিশোধেই চাপ বাড়ছে। কারণ অধিকাংশ বিদেশি ঋণের বিপরীতে রাষ্ট্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা বাণিজ্যিক ব্যাংকের গ্যারান্টি রয়েছে। ফলে কোনো ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে শেষ পর্যন্ত দায় বহন করতে হচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাতকে। বেসরকারি খাতের কিছু ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে বাজার থেকে উচ্চ দামে ডলার কিনে কিস্তি শোধ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, গত অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ অঙ্ক ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। শুধু চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সরকারি খাতেই প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি দেশের রিজার্ভ। ২০২০ সালে ঋণের বিপরীতে রিজার্ভের অনুপাত যেখানে ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২৩ শতাংশে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ঋণের অর্থ যদি রপ্তানিমুখী বা বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে পরিস্থিতি তুলনামূলক সহনীয় থাকত। কিন্তু অধিকাংশ প্রকল্প স্থানীয় মুদ্রা নির্ভর হওয়ায় ঋণের বিপরীতে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে অর্থ পাচারের অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

দেশের মানুষের ওপরও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০০৯ সালে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ছিল ১৬৯ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে ৬০০ ডলারের বেশি হয়েছে। অর্থাৎ একজন নাগরিকের ওপর ঋণের বোঝা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ জোরদার এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।